করোনার চেয়ে বেশি ভয় যক্ষ্মা, এইচআইভি, ম্যালেরিয়ায়

করোনার চেয়ে বেশি ভয় যক্ষ্মা, এইচআইভি, ম্যালেরিয়ায়

১৫ আগস্ট: কোভিড-১৯ বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র বদলে দিয়েছে। এই মহামারির বিস্তৃতিতে উদ্বেগে রয়েছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু করোনার চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে আরেকটি রোগ, যার নাম যক্ষ্মা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ১৫ লাখ মানুষ যক্ষ্মায় মারা যায়। করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে যে লকডাউন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে যক্ষ্মা, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগগুলো বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।
সাধারণত হালকা জ্বর ও অসুস্থতা দিয়ে যক্ষ্মার উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। এরপর শ্বাসকষ্ট ও ব্যথাযুক্ত কাশি শুরু হয়। যক্ষ্মা রোগীর আশপাশে থাকা মানুষের মধ্যে ছড়ায় বলে রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খোঁজ রাখা, পৃথক রাখা ও রোগীকে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলেই এই রোগ বিস্তার লাভ করেছে বলে সবচেয়ে সংক্রামক ও ভয়ঙ্কর হিসেবে এটি পরিচিতি পেয়েছে।
করোনা ভাইরাস আসার আগে পর্যন্ত যক্ষ্মার আরও দু’টি ভয়ঙ্কর বন্ধু হিসেবে ছিল এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া। গত এক দশকের মধ্যে ২০১৮ সালে এই দুটি রোগে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড গড়েছিল। তবে এ বছর করোনা ভাইরাস ধাক্কা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে। ফলে যক্ষ্মা, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে অবহেলা দেখানোয় এগুলো বড় বিপদ হয়ে উঠে আসতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যালেরিয়া কর্মসূচির কর্তা পেদ্রো এল আলোন্সো বলেন, ‘কোভিড ১৯–এর বিপদ আমাদের সব প্রচেষ্টার গতিপথ বদলে দিয়েছে। দুই দশক আগে আমরা যেখানে ছিলাম, এখন পিছিয়ে সেখানেই পৌঁছে গিয়েছি।’ বিশ্বের এক ডজনের বেশি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শুধু করোনা ভাইরাসই যক্ষ্মা, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া থেকে মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে না। লকডাউনের কারণে আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় এসব রোগ শনাক্ত ও ওষুধ প্রাপ্তিতে বড় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
করোনা ভাইরাসের ভয়ে অনেক ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক রোগী বঞ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া আকাশপথ ও সমুদ্রপথের বিধিনিষেধের কারণে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৮০ শতাংশ যক্ষ্মা, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া কর্মসূচির আওতায় থাকা পরিষেবা বিঘ্নিত হয়েছে। প্রতি চারজনের একজন এইচআইভি রোগী ওষুধ সমস্যায় পড়েছেন। চিকিৎসায় বিলম্ব বা বাধা তৈরি হলে অনেক রোগ ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে পড়ে, যার সমস্যায় ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ ভুগতে শুরু করেছে।
পশ্চিম আফ্রিকায় ইতিমধ্যে ম্যালেরিয়ার মরশুম শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের ৯০ শতাংশ ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু ঘটে সেখানে। কিন্তু সেখানে এই রোগ প্রতিরোধের জন্য সাধারণ ব্যবস্থা হিসেবে কীটনাশক ও মশারির মতো জিনিস লকডাউনের কারণে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারেনি। একটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন অংশে তিন মাসের লকডাউন এবং অন্যান্য কারণে আরও ৬৩ লাখ মানুষ যক্ষ্মা আক্রান্ত হবে এবং ১৪ লাখ মানুষ মারা যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি যদি ছ’মাস না পায়, তাহলে এইচআইভিতে আরও পাঁচ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। ফলে করোনা ভাইরাস মহামারি শেষ হলেও এর প্রভাব গরিবদের উপর দীর্ঘদিন থেকে যাবে। দীর্ঘদিন রোগ শনাক্ত না হলে এর চিকিৎসা পেতে দেরি হবে। পরিস্থিতি জটিল হবে। মানুষ বেশি আক্রান্ত হবে এবং মারা যাবে। ম্যালেরিয়া শনাক্তে দেরি হলে তা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় জ্বর বেড়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত এই ধরনের রোগের চিকিৎসা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো প্রতিষ্ঠান দ্য গ্লোবাল ফান্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, করোনা ভাইরাসের কারণে যক্ষ্মা, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধের অগ্রগতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেটাতে ২ হাজার ৮৫০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
স্টপ টিবি পার্টনারশিপ নামে আন্তর্জাতিক এক কনসোর্টিয়ামের প্রধান লুসিকা ডিটিউ বলেন, ‘আপনি যতটা শনাক্তবিহীন ও চিকিৎসাহীন রাখবেন, ততই পরের বছর তা বাড়তে থাকবে। অনেক দেশে এইচআইভি ও যক্ষ্মা শনাক্তের জন্য যেসব পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তা করোনার চিকিৎসার কাজে ব্যবহার হয়েছে।’ জিন এক্সপার্ট নামে যে টুল দিয়ে টিবি ব্যাকটেরিয়া ও এইচআইভির যে জেনেটিক উপাদান শনাক্ত করা হতো, এখন করোনা ভাইরাসের জন্য তা ব্যবহার করা হচ্ছে। যক্ষ্মার চেয়ে করোনা ভাইরাসকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি বোকামি। দু’টি কাজেই একে ব্যবহার করতে হবে। অনেক দেশ যক্ষ্মা শনাক্তকরণ কমিয়ে দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় কমেছে ৭০ শতাংশ, মোজাম্বিকে ৫০ শতাংশ ও চীনে ২০ শতাংশ যক্ষ্মা শনাক্তকরণ কমেছে। মেক্সিকোর পরামর্শক গ্রুপ মেডিকেল ইম্প্যাক্টের পরিচালক জর্জিও ফ্রানইয়ুতি জানিয়েছেন, মেক্সিকোতে কোনও জায়গায় কেউ যক্ষ্মা পরীক্ষা করছে না। চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকরা আটকে গিয়েছেন কোভিড-১৯–এর মধ্যেই। কিন্তু এর মধ্যে বড় দৈত্যটি হচ্ছে যক্ষ্মা। মৃত্যু ও মহামারির হিসাব ধরলে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে কোভিডের তুলনা চলে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব কোম্পানি আগে স্বল্পমূল্যে যক্ষ্মা বা ম্যালেরিয়ার রোগ শনাক্তের যন্ত্র তৈরি করত, তারা সবাই এখন করোনা ভাইরাসের পরীক্ষার আকর্ষণীয় ব্যবসায় নেমেছে। করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় যেখানে ১০ ডলার আসে, সেখানে মাত্র ১৮ সেন্টের ম্যালেরিয়া টেস্ট করবে কোন প্রতিষ্ঠান?