গান স্যালুট, চোখের জলে বিদায় প্রণবকে

গান স্যালুট, চোখের জলে বিদায় প্রণবকে

২১ তোপের স্যালুট। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরবিদায় ‘ভারতরত্ন’ প্রণব মুখোপাধ্যায়কে। দিল্লির লোধি রোড শ্মশানে অগ্নিস্পর্শে নশ্বর দেহ বিলীন হয়ে গেল পঞ্চভূতে! হল কোভিড প্রোটোকল মেনেই। রাতেই অস্থিভস্ম বিসর্জন করা হল হরিদ্বারের গঙ্গায়। অবসান হল একটি যুগের। মঙ্গলবার সকাল থেকে কোভিড সংক্রমণের ভয় উপেক্ষা করে ভিড় ছিল ১০ রাজাজি মার্গের বাড়িতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বাড়তে থাকে পরিচিত-পরিজনদের সংখ্যা। চিকিৎসাধীন থাকাকালীনই করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রণববাবু। তাই অধিকাংশের শেষ দেখাটুকু হল ছবিতেই। রাজাজি মার্গের একটি ঘরে কফিনবন্দি অবস্থায় শায়িত ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভার্চুয়াল বৈঠকে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। দু’মিনিটের নীরবতা। পরে এক বিবৃতিতে জানায়, জাতির প্রতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অবদান প্রশংসনীয়। সরকার ও দেশের পক্ষ থেকে পরিবারের সদস্যদের জন্য রইল গভীর সমবেদনা।
গত ৯ আগস্ট রাতে বাড়ির বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় প্রবল আঘাত পান প্রণববাবু। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ নিয়ে পরদিন তাঁকে ভর্তি করা হয় দিল্লির সেনা হাসপাতালে। মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পরেও দীর্ঘ সময় কোমায় আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। গত ৩১ আগস্ট বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ শেষ হয় সেই লড়াই। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি। মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় তাঁর দেহে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। সেই কারণেই প্রণববাবুর দেহ সাধারণের শ্রদ্ধার জন্য প্রকাশ্যে রাখা হয়নি।
প্রথমে একটি কাপড় পরিয়ে তার উপর মেডিকেটেড গজ দিয়ে সম্পূর্ণ মুড়ে দেওয়া হয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির দেহ। তার উপরে বরাবরের মতো ধোপদুরস্ত ধুতি, আর তসরের পাঞ্জাবি। গলায় জড়িয়ে দেওয়া হয় উত্তরীয়। কাঠের কফিনে একটিই অংশ ছিল কাচের... সেখান থেকে দেখা যাচ্ছিল প্রণববাবুর মুখাবয়ব। যাতে পরিবার সহ ঘনিষ্ঠরা শেষবারের মতো তাঁকে চাক্ষুষ করতে পারেন। যে ড্রয়িংরুমে নিত্য তাঁর
সাক্ষাৎ পাওয়া যেত, সেখানে রাখা একটি আঁকা ছবিতেই শ্রদ্ধা জানান বাকিরা। সেখানেই শেষ শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশের ঘরে রাখা কফিনটিকে প্রণাম করেন দূর থেকে।
নীলরঙা পিপিই পরে অন্ত্যেষ্টির কাজ করলেন পুত্র অভিজিৎবাবু। বলছিলেন, ‘পক্ষ-বিপক্ষ সবাইকে নিয়ে চলতে পারতেন বাবা। বলতেন, আর যাই হোক, কখনও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ো না। আর বলতেন, দেশকে যা দিয়েছি, তার চেয়ে পেয়েছি অনেক বেশি। তাই কারও কাছে আমাদের কোনও চাহিদা নেই।’ তবে একটিমাত্র অনুরোধ করেছেন তিনি। তা হল, সরকার যদি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জন্য কিছু করতে চায়, তাহলে তাঁর নামে ডাকটিকিট প্রকাশ করুক। পরিবারের পক্ষ থেকে জঙ্গিপুরের বাসভবনে প্রণব মুখোপাধ্যায় সংগ্রহশালা গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন অভিজিৎবাবু।
রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ থেকে শুরু করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, গুলাম নবি আজাদ, অধীররঞ্জন চৌধুরী, সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরির মতো ব্যক্তিত্বরা এদিন প্রণববাবুর প্রতিকৃতিতে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তথা প্রণববাবুর অত্যন্ত স্নেহভাজন শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে অর্পণ করা হয় পুষ্পার্ঘ্য। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যপাল জগদীপ ধনকারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা রামদাস মিনা। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রণববাবুকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির ছিলেন দলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র।
ঠিক বেলা ১টায় সদর দরজায়
এসে দাঁড়ায় ফুলের মালায় সজ্জিত অ্যাম্বুলেন্স। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষযাত্রার ব্যবস্থা হলেও কোভিডের কারণে সেনাবাহিনীর শকট (গান ক্যারেজ) ব্যবহার করা হয়নি। জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনবন্দি প্রণববাবুর দেহ পিপিই কিট পরিহিত সেনাবাহিনীর কর্মীরা কাঁধে করে ঘরের বাইরে নিয়ে আসতেই ওঠে জয়ধ্বনি। ‘প্রণব মুখার্জি অমর রহে,’ ‘যব তক সুরজ চাঁদ রহেগা, প্রণবদা কা নাম রহেগা’। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হতেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উঠল কান্নার রোল। বেজে উঠল সেনাবাহিনীর ব্যান্ড। বাজল ‘ডেড মার্চ ফর সোল’-এর সুর। শেষযাত্রায় চলে গেলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়!