প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে ব্যাঙ্ক জালিয়াতি, উদ্বেগে আরবিআই

প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে ব্যাঙ্ক জালিয়াতি, উদ্বেগে আরবিআই
প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে ব্যাঙ্ক জালিয়াতি, উদ্বেগে আরবিআই

 

লাগামছাড়া ব্যাঙ্ক জালিয়াতি। গোটা দেশেই। লুট হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। নোটবন্দি, জিএসটি বা অন্যান্য ব্যবস্থা—কোনও কিছুই রুখতে পারছে না প্রতারকদের। তারই প্রমাণ মিলল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) বার্ষিক রিপোর্টে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরে ব্যাঙ্ক জালিয়াতির অঙ্কটা প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে। ২০১৮-’১৯ অর্থবর্ষে প্রতারণার পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। এক বছরের মাথায়, অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে তা পৌঁছেছে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকায়। শতকরা হিসেবে দেখলে জালিয়াতি বেড়েছে ১৫৯ শতাংশ। যার সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে। যদিও প্রতারণার এই হিসেব কষতে গিয়ে শুধু এক লক্ষ বা তার বেশি টাকার জালিয়াতিকেই সামনে এনেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এর নীচের প্রতারণার অঙ্ক যোগ হলে মোট হিসেব যে আরও অনেকটাই বাড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসেব বলছে, ২০১৮-’১৯ অর্থবর্ষে এরকম মোট ৬ হাজার ৭৯৯টি জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছিল। এক বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭০৭টিতে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪১৩টিই ঘটেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে। অর্থাৎ মোট জালিয়াতির অর্ধেকের বেশি। এক্ষেত্রে প্রতারণার মোট অঙ্ক ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। যা মোট জালিয়াতির প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রতারণার নিরিখে এর পরে রয়েছে যথাক্রমে বেসরকারি ব্যাঙ্ক, ফরেন ব্যাঙ্ক, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আওতায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্মল ফিনান্স ব্যাঙ্ক, পেমেন্টস ব্যাঙ্ক এবং আঞ্চলিক ব্যাঙ্ক।
এ তো গেল গত দু’টি আর্থিক বছরের তুল্যমূল্য হিসেব। চলতি বছরে কী অবস্থা? দেখা যাচ্ছে দেশজুড়ে করোনা সংক্রমণের আবহেও ব্যাঙ্ক জালিয়াতিতে ছেদ পড়েনি। ২০২০-’২১ অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাস, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশে প্রতারণার অঙ্কটা ২৮ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। প্রকাশ্যে এসেছে ১ হাজার ৫৫৮টি জালিয়াতির ঘটনা। এখানেও কাঠগড়ায় সেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। সেখান থেকে মোট ১৯ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা খোয়া গিয়েছে। সংখ্যার বিচারে ঘটনা ৭৪৫টি। ব্যাঙ্কগুলির ফঁাকফোঁকর আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে এই পরিসংখ্যান। বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বোঝার পরোক্ষ চাপ সামলাতে হচ্ছে মানুষকেই।
কিন্তু কীভাবে হয়েছে এই কোটি কোটি টাকার প্রতারণা? তার জবাবও দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট। আরবিআইয়ের দাবি, মূলত ঋণ নেওয়ার নাম করেই টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জালিয়াতরা। গত আর্থিক বছরে যত টাকার প্রতারণা হয়েছে, তার ৭৬ শতাংশই খোয়া গিয়েছে মাত্র ৫০টি ঘটনায়। আর সবটাই হয়েছে ঋণ নেওয়ার নাম করে। অর্থাৎ হাতে গোনা কয়েকজন রাঘববোয়ালের হাত ধরেই লুট হয়ে গিয়েছে কোটি কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাকা ধার নিয়ে শোধ না দেওয়া একরকম অপরাধ। সেক্ষেত্রে ব্যাঙ্কের অনাদায়ী টাকার বোঝা বাড়ে। এনপিএ বা অনুৎপাদক সম্পদের চাপ ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বাস্থ্যে বড় রকমের প্রভাব ফেলে। কিন্তু এই জালিয়াতি আরও মারাত্মক। যদি ঋণগ্রহীতার হদিশই না পাওয়া যায়, তাহলে ব্যাঙ্কের ক্ষতি পুরোটাই। তালিকায় এরপরেই রয়েছে বৈদেশিক লেনদেন, ব্যালেন্স শিটে গরমিল, অনলাইন, ডিপোজিট, ব্যাঙ্কের একটি শাখার সঙ্গে অপর শাখার অন্তর্বর্তী লেনদেন, নগদ টাকা, চেক এবং ড্রাফ্ট সংক্রান্ত প্রতারণা।
কেন বাড়ছে জালিয়াতি? রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বলছে, এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ব্যাঙ্ক নিজেই। কারণ প্রতারণা রুখতে যে যে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সেগুলি কার্যকর করার ক্ষেত্রেই চলছে ঢিলেমি। অন্তর্বর্তীকালীন নিজস্ব অডিটেও রয়ে গিয়েছে ফাঁকফোকর।