সরকারি নির্দেশ উপেক্ষিত, বাসের দ্বিগুণ ভাড়া বৃদ্ধির কোপে নাজেহাল নিত্যযাত্রীরা

সরকারি নির্দেশ উপেক্ষিত, বাসের দ্বিগুণ ভাড়া বৃদ্ধির কোপে নাজেহাল নিত্যযাত্রীরা

 সাত হয়েছে দশ। এগারো হয়েছে কুড়ি। আর দু’শো বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারশো কিংবা সাড়ে চারশোর ঘরে! দ্বিগুণ ভাড়া না ধরালে বাসের টিকিট নেই! সাঁতরাগাছি থেকে ধর্মতলা। গড়িয়া থেকে হাওড়া। বারাকপুর থেকে শ্যামবাজার। আবার ধর্মতলা-হাওড়া থেকে দীঘা কিংবা দুর্গাপুর। ধর্মতলা থেকে মেদিনীপুর, বহরমপুর অথবা শিলিগুড়ি। মহামারীর সুযোগে বাস যাত্রীদের পকেটে পড়ছে ‘মহা কোপ’। মালিকদের ‘স্বঘোষিত’ ভাড়া বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠছে আমজনতার।
কেন ‘স্বঘোষিত’? ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে লকডাউনের পর আন্দোলনে নামেন মালিকরা। টানা ধর্মঘটও হয়। রাজ্যের সঙ্গে বৈঠকের পর বৈঠক চলে। কিন্তু ভাড়া বৃদ্ধির সবুজ সঙ্কেত দেয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বরং কড়া হাতে মালিকদের পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। লকডাউন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সুরাহা দিতে তাঁর এই কড়া পদক্ষেপ। মমতার সাফ নির্দেশ ছিল­—‘কোনওভাবেই ভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না। প্রয়োজনে বেসরকারি বাস অধিগ্রহণ করে সরকারই চালাবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানে ধর্মঘট উঠল ঠিকই। কিন্তু ঘটনা হল, রাস্তায় বাস নামিয়ে নিজেদের দাবিতেই অনড় রইলেন এক শ্রেণীর মালিকরা। ফলে ন্যূনতম ভাড়া যেখানে ছিল সাত টাকা, সেটাই এখন ১০ টাকা। দূরপাল্লার বাসেও ন্যূনতম ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠছে। উপেক্ষিত সরকারি নির্দেশ। ‘কে শোনে কার কথা’ গোছের মনোভাব বাস মালিকদের। জাঁতাকলে পড়ে দুর্বিষহ অবস্থা যাত্রীদের। অগত্যা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাঁদের। কোথাও কোথাও প্রতিবাদ হচ্ছে। কিন্তু সুরাহা মিলছে না। বাস কন্ডাক্টরদের স্পষ্ট জবাব—‘বর্ধিত ভাড়া দিলে দিন, না হলে নেমে পড়ুন।’ দূরপাল্লার বাস ছাড়ে মূলত ধর্মতলা, বাবুঘাট, হাওড়া থেকে। এই দুই বাসস্ট্যান্ডের টিকিট কাউন্টারগুলিতেও একই কথা। যাত্রী-কন্ডাক্টরদের মধ্যে নিত্য ঝামেলা চলছে। অথচ, পুলিস-প্রশাসন নীরব দর্শক। যাত্রীদের অভিযোগ এমনটাই।
ভাড়া বৃদ্ধির কথা স্বীকারও করে নিচ্ছেন বাস মালিকদের একটা অংশ। জয়েন্ট কাউন্সিল অব বাস সিন্ডিকেটের সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘অটো ইউনিয়নগুলি দুই থেকে তিন গুণ ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। সেখানে কেন প্রতিবাদ হচ্ছে না? সরকার বাসভাড়া বৃদ্ধি করছে না। শ্রমিক, মালিকদের পেটে টান পড়েছে। পরিষেবা চালু রাখতে কিছু রুটে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।’ অল বেঙ্গল বাস-মিনিবাস সমন্বয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘ভাড়া বৃদ্ধির এক্তিয়ার আমাদের নেই। কেউ তা করে থাকলে আইনত অন্যায় করেছে।’  
রাহুলবাবু ভাড়া বৃদ্ধিকে ‘অন্যায়’ বললেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ২২২, ৪৩, ৭৮/১, এল ৩৯, ৮০এ, ২২৮, বেলুড় মঠ-ধর্মতলা, সালকিয়া-খিদিরপুর, ৫৪, ৫১, ৫৬, ১২, ১২সি, ২৪এ, সহ অধিকাংশ রুটে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া গুনছেন যাত্রীরা। যেমন, গড়িয়ার বাসিন্দা স্বরূপ ঘোষের কথায়, ‘এখন তো বাসে উঠলেই ১০ টাকা দিতে হচ্ছে। অথচ সরকার বলছে ভাড়া বৃদ্ধি হয়নি।’ হাওড়ার বাসিন্দা অজয় বসু বলেন, ‘বেলুড় মঠ-ধর্মতলা রুটের ভাড়া ছিল ১১ টাকা। বর্তমানে তা ২০ টাকা হয়েছে। সাঁকরাইল থেকে ধর্মতলা যেতে ১০ টাকা লাগত। এখন বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ।’ শ্যামবাজারের বাসিন্দা তথা অধ্যাপক সুনীত বসুর দাবি, ‘উত্তর কলকাতার অধিকাংশ রুটে বাসভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, রাত আটটার পর এই দ্বিগুণ ভাড়া আরও বেড়ে যায়।’ দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন যাত্রীরা। হাওড়া থেকে দীঘা ভাড়া ছিল ১৮০ টাকা। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৪০০ টাকা। বর্ধমান, দুর্গাপুর, মেদিনীপুর সহ ভিন জেলার বাসের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ধর্মতলা থেকে দুর্গাপুরের ভাড়া যেখানে ছিল ৮০ টাকা, সেটা এখন হয়েছে ২০০ টাকা। সব মিলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। এনিয়ে পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।