৩০ বছর ধরে পাহাড়ে খাল কেটে মাওবাদী গ্রামে জল আনলেন বিহারের চাষি লাউঙ্গি

৩০ বছর ধরে পাহাড়ে খাল কেটে মাওবাদী গ্রামে জল আনলেন বিহারের চাষি লাউঙ্গি

‘মাউন্টেন ম্যান’ দশরথ মাঝিকে এখন সকলেই চেনে। বিহারের গয়ার বাসিন্দা। গেহলৌর পাহাড় কেটে আতরি থেকে ওয়াজিগঞ্জ আস্ত একটা রাস্তা বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। টানা বাইশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে। তাঁকে অনুসরণ করে এবার খাল কেটে গ্রামে জল ঢোকালেন লাউঙ্গি ভুঁইয়া। ঘটনাচক্রে লাউঙ্গির বাসও গয়ায়। দশরথের মতো তিনিও ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। গ্রামে জল ঢোকাতে তাঁর সময় লাগল ৩০ বছর! রাস্তা তৈরির চেয়ে আট বছর বেশি। এক্ষেত্রেও ‘নিষ্ক্রিয়’ প্রশাসন দাঁড়িয়ে দেখল কর্মে নিষ্ঠা আর সদ্দিচ্ছা থাকলে ঊষর জমিকে সুজলাসুফলা করা যায়!
কোথিলওয়া গ্রামে বেড়ে ওঠা লাউঙ্গির। গ্রামের চারপাশে ঘন জঙ্গল। পাহাড় দিয়ে ঘেরা। দুর্গম পরিবেশকে কাজে লাগিয়েছিল মাওবাদীরা। তাই জেলা প্রশাসনের খাতায় গ্রামের পরিচয় ‘মাও-অধ্যুষিত’। পুলিসের কড়া নজরদারি এড়াতে গ্রামবাসীদের ঘরে ঘাপটি মেরে থাকে মাওবাদী স্কোয়াড সদস্যরা। কোথিলওয়া থেকে সদর শহর গয়ার দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। অভাবী গ্রামবাসীদের অনেকেই পেটের টানে সেখানে পাড়ি দেন। বাকিরা গ্রামে থেকে চাষবাস করেন।
বয়স বাড়ার পর লাউঙ্গিও চাষবাসকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু জমিতে কাজে নেমে তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ে। বুঝতে পারেন, জল ছা‌ড়া ফসল ফলবে না। পাশেই জঙ্গল, পাহাড়। অথচ, সমতলে চাষের খেত শুকনো, খটখটে। তাঁদের গ্রাম এমন খরা কবলিত কেন? কারণ খুঁজতে পাহাড়ে উঠতে শুরু করেন লাউঙ্গি। তখনই তাঁর নজরে আসে, বর্ষার মরশুমে বৃষ্টির জল পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে ঠিক উল্টো দিকের নদীতে পড়ছে। গ্রামের ভাগ্যে জুটছে না তার সিকি অংশও। লাউঙ্গি ঠিক করে ফেলেন, যে করেই হোক বর্ষার জলকে গ্রামের দিকে টেনে আনতে হবে। তার জন্য জরুরি জলস্রোতের খাত বদল। আর তা করতে হলে কাটতে হবে পাহাড়। ৩০ বছর আগে প্রথম পাহাড়ের গায়ে কোদাল-শাবলের কোপ মারেন লাউঙ্গি।
গোটা সমস্যা আর তার সমাধান যে শুধু লাউঙ্গি ভেবেছিলেন, এমনটা নয়। বাকি গ্রামবাসীরাও বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু এগিয়ে আসেননি কেউ। বাধ্য হয়ে টানা ৩০ বছর ধরে একা হাতেই অসাধ্য সাধন করেছেন লাউঙ্গি। পাহাড়ের বর্ষার জল এখন গ্রামে ঢোকার মুখে। ক্যানাল তৈরি শেষ হওয়ার পর অবশ্য লাউঙ্গির আত্মত্যাগকে কুর্নিশ জানাতে এগিয়ে এসেছেন গ্রামবাসীরা। নেটদুনিয়ার কাছেও তিনি ‘রিয়েল হিরো’। পাত্তি মাঝি নামে এক গ্রামবাসীর কথায়,‘লাউঙ্গির কাজ গ্রামের চাষের জমিকে উর্বর করে তুলবে। নিজের কথা না ভেবে সকলের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে তিনি যেভাবে খালটি বানিয়েছেন, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।’ কিন্তু লাউঙ্গি কি আদৌ ঘুম ভাঙাতে পারলেন জেলা প্রশাসনের? এখনও পর্যন্ত তাঁর কর্মফলকে সম্মান জানাতে এগিয়ে আসেননি সরকারি কর্তারা!